রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ এলাকায় ফুলজোড় নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি সেতু ঘিরে দেখা দিয়েছে জটিলতা। স্থানীয়দের বহুদিনের প্রত্যাশার এই সেতুর কাজ প্রায় ২০ শতাংশ সম্পন্ন হলেও সংযোগ সড়কের নির্ধারিত স্থানে একটি বাড়ি থাকায় ভূমি অধিগ্রহণ সমস্যার কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি থমকে গেছে। এতে আড়াই লাখ মানুষের স্বপ্নের সেতু বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফুলজোড় নদীর দুই পাড়ের দাদপুর, সাহেবগঞ্জ, ফরিদপুরসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ করতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সেতু নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে। সেতুটি নির্মিত হলে রায়গঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে এবং সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে।
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, “সাহেবগঞ্জ ফুলজোড় নদীর ওপর পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (২য় পর্যায়) (সিআইবিআরআরপি-২)” প্রকল্পের আওতায় ৪৩ কোটি ৩০ লাখ ৮৯ হাজার ৫৮৩ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এবং ৪২ কোটি ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭৭৭ টাকা চুক্তি মূল্যে টেন্ডারের মাধ্যমে মেসার্স মোস্তফা কামাল ট্রেডার্স কাজটির কার্যাদেশ পায়। ৭১০০ মিটার চেইনেজে নির্মিতব্য সেতুটির দৈর্ঘ্য ৩০০ দশমিক ৪০ মিটার।
ইতোমধ্যে সেতুর পাঁচটি পিলারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে পশ্চিম পাড়ে সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় প্রকল্পের কাজ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে নদী পারাপারে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও রোগীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় নদী পার হতে হয়। সেতুটি নির্মিত হলে প্রায় আড়াই লাখ মানুষের যাতায়াত সহজ হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নলকা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি এনামুল হক মাস্টার বলেন, “একটি বাড়ির কারণে পুরো এলাকার উন্নয়ন থমকে থাকতে পারে না। আমরা চাই বাড়ির মালিক ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাক এবং সাধারণ মানুষও তাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি লাভ করুক। দ্রুত সমাধানের জন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।”
নলকা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, “ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সেতুর কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।”
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোস্তফা কামাল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোস্তফা কামাল বলেন, “সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আমরা শুরু থেকেই আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু সংযোগ সড়কের জায়গা নিয়ে জটিলতার কারণে কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়টি দ্রুত সমাধান হলে আমরা স্বল্প সময়ের মধ্যেই নির্মাণকাজের গতি বাড়িয়ে প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে পারব।”
তবে এ বিষয়ে ভুক্তভোগী বাড়ির মালিক আমির হোসেন ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, “আমি উন্নয়ন কাজের বিরোধী নই। এলাকার মানুষের সুবিধার জন্য সেতু নির্মাণ হোক, সেটাই চাই। কিন্তু আমার বসতবাড়ি ও সম্পত্তি অধিগ্রহণের বিষয়ে এখনো সন্তোষজনক কোনো সমাধান হয়নি। আমি ন্যায্য মূল্য ও পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা চাই। আমার পরিবারের বসবাসের একমাত্র জায়গা এটি। তাই যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও বিকল্প ব্যবস্থার নিশ্চয়তা ছাড়া বাড়ি ছেড়ে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
উপজেলা প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, “সেতুর কাজ চলমান রয়েছে। তবে সংযোগ সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। বিষয়টি সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। সমস্যা সমাধান হলে দ্রুত কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।”
এদিকে এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তির অবসান ঘটাতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তাদের মতে, একটি মাত্র বাড়ির কারণে আড়াই লাখ মানুষের যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে না। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করে দ্রুত সব জটিলতা নিরসনের মাধ্যমে ফুলজোড় নদীর ওপর স্বপ্নের সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।