নিজস্ব প্রতিবেদক,
শিল্প আর বাস্তবতা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনের মাঝেই একজন শিল্পীর জীবন গড়ে ওঠে। কখনো কখনো একজন শিল্পী নিজেই হারিয়ে ফেলেন তিনি বাস্তবের মানুষ, নাকি গল্পের কোনো চরিত্র। তবুও সকল দুঃখ, কষ্ট, সংগ্রাম আর ত্যাগকে সঙ্গী করে শিল্পী এগিয়ে যান তাঁর শিল্পস্বত্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে। ঠিক তেমনই এক লড়াকু, পরিশ্রমী ও স্বপ্নবাজ নাট্যকর্মীর নাম তারিকুল ইসলাম মানিক।
মফস্বলের ছোট্ট পরিসর থেকে উঠে আসা এই তরুণ শিল্পী আজ নাট্যাঙ্গনে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করে চলেছেন। তাঁর পথচলা সহজ ছিল না। ছিল অজস্র প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা আর সংগ্রামের গল্প। কিন্তু থেমে যাননি তিনি। বরং প্রতিটি বাধাকেই করেছেন নিজের শক্তিতে পরিণত।
শৈশব থেকেই সংস্কৃতির প্রতি ছিল গভীর ভালোবাসা। স্কুলজীবনে তিনি স্বপ্ন দেখতেন কণ্ঠশিল্পী হওয়ার। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বোনের সহযোগিতায় ভর্তি হন টাঙ্গাইল জেলা শিল্পকলা একাডেমি-তে। টানা ছয় মাস নিয়মিত সংগীতচর্চার পর তিনি উপলব্ধি করেন, গান হয়তো তাঁর জন্য নয়। কিন্তু সৃষ্টিশীলতার জগত থেকে দূরে সরে যাওয়ার মানুষ তিনি নন। তাই নতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার করতে বেছে নেন অভিনয়কে।
হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর শ্রদ্ধেয় শিক্ষক রফিকুল ইসলাম স্যারের অনুপ্রেরণায় যুক্ত হন একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে। পাশাপাশি শিশুসাংবাদিক হিসেবেও কাজ শুরু করেন একটি পত্রিকায়। সেখানেও তাঁর মেধা ও নিষ্ঠা প্রশংসিত হয়।
২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি যুক্ত হন মানবাধিকার নাট্য পরিষদ-এর সঙ্গে। এরপর যোগ দেন নগর নাট্য দল-এ। মূলত এখান থেকেই তাঁর নাট্যজীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। মঞ্চনাটকের কঠিন অনুশীলন, অভিনয়ের শৈলী এবং চরিত্র নির্মাণের গভীরতা তাঁকে ধীরে ধীরে একজন পরিণত শিল্পীতে রূপ দেয়।
নাট্যনির্দেশক উৎপল কুমার চক্রবর্তী-এর নির্দেশনায় মঞ্চনাটকে তাঁর আনুষ্ঠানিক পদার্পণ ঘটে। আজও অভিনয়ের সূক্ষ্ম দিকগুলো আয়ত্ত করতে তিনি তাঁর গুরুর পরামর্শ গ্রহণ করেন। তাঁর অভিনয়ে যেমন রয়েছে আবেগ, প্রেম, মায়া ও মানবিকতা, তেমনি রয়েছে সমাজবাস্তবতার তীক্ষ্ণ প্রকাশ।
তারিকুল ইসলাম মানিক শুধু অভিনেতাই নন; তিনি একাধারে সংগঠক, সাংবাদিক, লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মী। সংস্কৃতির নানা শাখায় তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পী হিসেবে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
তাঁর এই পথচলায় পাশে থেকেছেন অনেক নাট্যকর্মী ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মনির হোসেন, জহুরুল হক কিরণ, শাহ আজিজুল কদর বাবু, স্বপন ভট্টাচার্য, কুশল ভৌমিক, রবিউল ইসলাম রবি, আলামিন তালুকদারসহ আরও অনেকে। তাঁদের ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণাই তাঁর পথচলার শক্তি হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে তিনি ঈদ উপলক্ষে একাধিক নাটকের কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সম্প্রতি দ্বিমুখী প্রেমকাহিনি অবলম্বনে নির্মিত একটি নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন মোহসিন কবির বাবু এবং পরিবেশনায় ছিল Prime Time Drama BD। এতে আরও অভিনয় করেছেন মেঘলা খান, মোশাররফ হোসেন মিশু, মনীষা শিকদার, সাজু মেহেদী, শিল্পী, সাগরসহ অনেকে।
এছাড়াও সামনে আসছে তাঁর অভিনীত আরও কয়েকটি ঈদের নাটক, যা নিয়ে দর্শকদের মাঝেও তৈরি হয়েছে আগ্রহ।
তারিকুল ইসলাম মানিক বিশ্বাস করেন—নাটক শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার। নাটকের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও সমাজবাস্তবতাকে তুলে ধরা সম্ভব। তাঁর স্বপ্ন, একদিন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন আরও সমৃদ্ধ হবে শিল্পীদের সৃষ্টিশীল স্পর্শে।
মফস্বলের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে যে তরুণ আজ স্বপ্ন বুনছেন আলো ছড়ানোর, তাঁর গল্প নিঃসন্দেহে নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার। হয়তো একদিন এই তারিকুল ইসলাম মানিকই হয়ে উঠবেন বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের উজ্জ্বল এক নক্ষত্র।
“নাটকে বাঁচি, নাটকে থাকি, নাটকেই রয়ে যেতে চাই চিরকাল।”